ধূমপান মৃত্যুর কারন, কতটা সত্য কতটা মিথ্যা?

ধূমপান বিষপান। কথাটাতে এক বিন্দু মিথ্যা নেই। ধূমপান হল এমন একটি বদঅভ্যাস যা আপনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। ধূমপানকে অনেকে স্মার্টনেস মনে করে কিন্তু আসল স্মার্ট তো তারাই যারা বুক ফুলিয়া বলতে পারে, ‘ আমি একজন অধূমপায়ী।’

ধূমপানের কুফল সম্পর্কে বলতে গেলে চোখের সামনে ভেসে উঠবে শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ। কারন ধূমপানের ফলে শরীরের প্রায় সকল সিস্টেমই আক্রান্ত হয়। বিড়ি হোক আর সিগারেট হোক বা হোক সে পাইপ বা হুক্কা সকল ধরনের ধূমপানই স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। একটি সিগারেটে প্রায় ৬০০ উপাদান থাকে যা পুড়ে প্রায় ৭০০ কেমিকেলের জন্ম দেয়। এই কেমিকাল গুলোর বেশীরভাগই মানবদেহে নানা রকম রোগের উৎপত্তি ঘটায় এবং ৬৯ টি কেমিকেল ক্যানসার রোগ সৃষ্টির সাথে সম্পর্কযুক্ত। সেদিক থেকে দেখলে ধুমপান শুধু বিষপান নয় বরং তার থেকেও বেশী।

ধূমপানের ফলে শরীরে যে অঙ্গ বা সিস্টেম গুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়ঃ

১) স্নায়ুতন্ত্রঃ

ধূমপান শুরুর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিকোটিন নামক একটা পদার্থ আমাদের মস্তিস্কে পৌছায়। নিকোটিনের দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একটি হল নিকোটিন মস্তিস্কে গেলে আমরা ভাল বোধ করি, আমাদের মুডটা ভাল হয় যদিও সেটা সাময়িক, কিছুক্ষন পরে উলটো ক্লান্তি ভর করে। আর দ্বিতীয়টি হল নিকোটিনটা হল সিগারেটের সেই উপাদান যেটায় মানুষ নেশাগ্রস্থ হয়। মস্তিস্ক যখন নিকোটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তখন নিকোটিন ছাড়া আমাদের অস্বস্তি বোধ হয়, মুড ভাল থাকে না ও কাজের এনার্জি পাই না। ধূমপানে একবার অভ্যস্ত হয়ে পড়লে ধূমপান ছাড়ার পথে সিগারেটের যে উপাদানটি বাধা হয়ে দাড়ায় সেটি এই নিকোটিন।

২) শ্বাসতন্ত্রঃ

আমরা যখন শ্বাস নেই তখন বাতাসের সাথে আমরা অক্সিজেন গ্রহন করি যেটা ফুসফুস হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে পৌছায়। একবার ভাবুনতো আপনি যদি সেই বাতাসের সাথে ক্ষতিকর ধোঁয়া গ্রহন করেন তাহলে অবস্থা কি দাড়াতে পারে? আপনার শ্বাসনালী ও ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে, সব সময় কাশি থাকতে পারে, হতে পারে আরও মারাত্মক কিছু অসুখ যেমনঃ শ্বাসনালীর প্রদাহ, সিওপিডি( হাপানির মত একটি রোগ যাতে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়), ফুসফুস ক্যানসার ইত্যাদি। যার অনেক রোগই একবার হয়ে গেলে আর পুরোপুরি সেরে ওঠে না।

৩) হৃদপিণ্ড ও রক্তপ্রবাহতন্ত্রঃ

হৃদপিণ্ড ও রক্তপ্রবাহতন্ত্র গড়ে ওঠে হৃদপিণ্ড এবং রক্তবাহী নালী নিয়ে। ধূমপানের ফলে রক্তবাহী নালী সংকুচিত হয়ে যায়, রক্তবাহী নালীর দেয়াল দুর্বল হয়ে পড়ে ও রক্তচাপ বাড়ে। আর ফলাফল স্ট্রোকসহ বিভিন্ন ধমনীর রোগ। এছাড়াও ধূমপায়ীরা বিভিন্ন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

৪) পরিপাক্তন্ত্রঃ

ধূমপানের ফলে মুখে, গলায়, খাদ্যনালীতে ও পাকস্থলীতে ক্যানসার হতে পারে। ভুগতে পারেন পেপটিক আলসার এ যেটাকে আমারা গ্যাস্ট্রিক বা গ্যাস্ট্রিক আলসার নামে চিনি। এছাড়া ধূমপান ডায়বেটিস ও প্যানক্রিয়েটিক ক্যানসারের সম্ভাবনাও বাড়ায়।

৫) যৌনতন্ত্রঃ

ধূমপায়ীরা কিছু যৌন সমস্যারও সম্মুখীন হয়ে থাকেন। দেখা যায় ধূমপান পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ভাবেই আলাদা আলাদা প্রভাব ফেলে, তবে প্রক্রিয়াটা একই। বিড়ি সিগারেটের নিকোটিন নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমায়। ফলে পুরুষের ক্ষেত্রে লিঙ্গের শিথিলতা দেখা দিতে পারে, যেটা খুব বেশী দেখা যায়। নারীদের ক্ষেত্রে যোনিপথের পিচ্ছিলতা কমে যায় এবং চূড়ান্ত তৃপ্তি লাভে অক্ষমতা দেখা দেয়। ধূমপানের ফলে মানব দেহে সেক্স হরমন নিঃসরণ কমে যেতে পারে। তখন যৌন ক্রিয়ার প্রতি কোন আগ্রহই থাকে না। এছাড়াও ধূমপায়ীরা আরও কিছু যৌন সমস্যায় ভুগে থাকেন। বলা যায় ধূমপান আপনার যৌন জীবনকে শেষই করে দিতে পারে।

এছাড়াও ধূমপানের ফলে ক্ষুধামন্দা, অবসাদ, খাবারে স্বাদ না লাগা, কোলেস্টেরল বাড়া, ডায়বেটিস রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়াসহ প্রভৃতি রোগ দেখা দিতে পারে।

ধূমপান ছাড়া কষ্টকর, তবে অসম্ভব নয়। যেটা দরকার সেটা প্রবল ইচ্ছা। সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কি একটি সুস্থ সবল দেহ নিয়ে বেচে থাকতে চান নাকি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে চান মৃত্যুর দিকে ?